কলঙ্কের সংসার
✍️ Sumi Akhtar
পর্ব – ০২
বাবার ফেরা
বহুদিন পর বাবাকে দেখে লিনার বুক ভরে ওঠে অশ্রুভেজা সুখে। কিন্তু সেই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রহিসের চোখ এড়িয়ে যায়নি মেয়ের ভাঙাচোরা চেহারা, শুকিয়ে যাওয়া মুখমণ্ডল আর ক্লান্ত শরীর।
রহিস প্রশ্ন করে—
“লিনা, তুমি স্কুলে যাচ্ছ না কেন? এত শুকিয়ে গেছো কেন?”
লিনা উত্তর দিতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়। মনে পড়ে যায় চাচার হুমকি—“কাউকে কিছু বললে মেরে ফেলব।” তাই ভয়ে মুখ নামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
অন্যদিকে জমিলা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে ওঠে—
“আহা, মেয়েটা একটু কাজ করছে তাই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমি তো বলি, নতুন মা আসায় সংসার সুন্দরভাবে চলছে।”
রহিস চুপ করে যায়। কিন্তু বুকের ভেতর অজানা কষ্ট তোলপাড় করে।
---
বাচ্চাদের আশা ভঙ্গ
আহান আর লিমনও বাবাকে দেখে আনন্দে ছুটে আসে। অথচ রহিম পাশে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। মনে মনে ভাবে—
“বাচ্চাগুলো যদি কিছু বলে বসে তাহলে তো সব ফাঁস হয়ে যাবে।”
সে জমিলাকে ইশারায় সাবধান করে দেয়।
রাতের খাবারের টেবিলে রহিস লক্ষ করে—বাচ্চারা ভয়ে ভয়ে খাচ্ছে, অথচ জমিলা আর রহিম ফিসফিস করে হাসাহাসি করছে। তার মনে সন্দেহ আরও গাঢ় হয়।
---
মায়ের অভাব
বাচ্চারা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। লিনা কাঁপা গলায় বলে—
“বাবা, মা’কে একবার দেখতে চাই…”
এই কথা শুনে রহিস থমকে যায়। তার নিজেরও বুক হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু জমিলা তৎক্ষণাৎ কথা কেটে দিয়ে বলে—
“ওসব এখন সম্ভব নয়। বাচ্চাদের মাথায় বাজে চিন্তা ঢুকিও না।”
রহিস আর কিছু বলে না। মনে মনে ভাবে, এ সংসারে কিছু একটা ঠিক নেই।
---
রহিমের ভয়
রহিসের ফেরা রহিমকে অস্থির করে তোলে। রাত গভীর হলে জমিলাকে বলে—
“ও বাচ্চাগুলো যদি সত্যি কথা বলে ফেলে, তাহলে শেষ! কিছু একটা করতে হবে।”
জমিলা ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করে—
“তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমি সামলে নেব। ওরা মুখ খোলার সাহস পাবে না।”
কিন্তু রহিমের চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
---
লিনার দ্বন্দ্ব
সেদিন রাতে লিনা ঘুমাতে পারে না। মনে মনে ভাবে—
“বাবাকে সব বলব নাকি? না বললে আমরা কষ্টে মরে যাব, বললে আবার চাচা আমাদের মেরে ফেলবে।”
অশ্রুতে বালিশ ভিজে যায়। তবুও ভয়ে মুখ খুলতে পারে না।
---
বিলকিসের একাকীত্ব
অন্যদিকে মাদ্রাসার পাশের ভাড়া ঘরে বিলকিস দিন গুনছে। তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীর নিয়ে একাকী বসে সন্তানের কথা ভেবে কাঁদছে। বুকের ভেতর হাহাকার—
“একবার যদি আমার লিনা, লিমন, আহান আর আলীকে চোখের সামনে দেখতে পেতাম!”
কিন্তু সমাজের চোখে সে আজও “কলঙ্কিনী।” প্রতিবেশীরা তার সাথে মিশতে চায় না।
---
রহিসের সন্দেহ
পরের দিন রহিস বাচ্চাদের স্কুল নিয়ে প্রশ্ন করে। লিমনের চোখে জল চলে আসে। আহান ভয় পেয়ে ফিসফিস করে বলে ফেলে—
“আমরা স্কুলে যাই না বাবা। চাচা আমাদের যেতে দেয় না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে সব বদলে গেছে।”
রহিসের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। সন্দেহ যেন সত্যির দিকে এগোতে থাকে।
চলবে…
